ফ্যাসিবাদ এবং সমাজবিপ্লব
[১৯৩৫ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে কমরেড জর্জি ডিমিট্রভের যুক্তফ্রন্ট তত্ত্ব গৃহীত হওয়ার পূর্বই ১৯৩৪ সালে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিশ্ব-কমিউনিস্ট আন্দোলনের সুপরিচিত নেতা ও তাত্ত্বিক কমরেড রজনী পাম দত্ত ‘ফ্যাসিজম অ্যান্ড সোশাল রেভলিউশন’ গ্রন্থ মারফত শ্রমিকশ্রেণীর হাতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটি তীক্ষ্ণ তত্ত্বগত হাতিয়ার তুলে দেন।
আর্থনীতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি দেখান ফ্যাসিবাদ হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের মরিয়ার মতো টিকে থাকার চেষ্টা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম তাই শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিক কর্তব্য।বইটির দ্বাদশ অধ্যায়ে তিনি পুঁজিবাদের প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বজোড়া সংকট, ‘পুজিবাদের স্থিতিশীলতা’ তত্ত্বের অন্তঃসারশূন্যতা এবং ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের গর্ভ থেকে কিভাবে ফাইনান্স ক্যাপিটালের মালিকদের সাহায্যপুষ্ট চরম সন্ত্রাসবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রযন্ত্র আত্মপ্রকাশ করে—তথ্য ও যুক্তির সাহায্যে তা বিশদভাবে তুলে ধরেন।ফ্যাসিবাদের শ্রেণীরূপ বিশ্লেষণ করে কমরেড দত্ত বলেছেন যে এর কোনো সুসংবদ্ধ সংজ্ঞা নির্দেশ করা যায় না। তবে এ-কথা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হচ্ছে ফাইনান্স ক্যাপিটালের মালিকদের নিষ্ঠুরতম সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্র।পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবাদের আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে তিনি দেখান বুর্জোয়া-গণতন্ত্রীরা কিভাবে কমিউনিজম-বিরোধিতা থেকে শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্যকে ভেঙে ফ্যাসিবাদের বিকাশে সহায়তা করে।ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর ফ্রন্ট তা সত্ত্বেও কমিউনিজমের জয়কেই অনিবার্য করে তুলবে—এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে কমরেড রজনী পাম দত্ত তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ শেষ করেছেন।
এই প্রসঙ্গে বলা দরকারIndia Today-র লেখক হিসেবে কমরেড রজনী পাম দত্ত এ-দেশের শ্রমিক আন্দোলনের অত্যন্ত আপনজন।কমরেড ডিমিট্রভের যুক্তফ্রন্ট তত্ত্ব গৃহীত হওয়ার পর ভারতের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগের ব্যাপারে পাম দত্ত কমরেড বেন ব্রাডলির সঙ্গে যৌথভাবে একটি থিসিস দাখিল করেন যা দত্ত-ব্রাডলি থিসিস নামে পরিচিত।
এখানে ‘ফ্যাসিজম অ্যান্ড সোশ্যাল রেভলিউশন’ গ্রন্থের মূল্যবান ভূমিকাটির সংক্ষেপিত অনুবাদ প্রকাশ করা হল।—অনুবাদক]
বর্তমান সমাজের সামনে মাত্র দুটো রাস্তা খোলা আছে। একটা হল—উৎপাদনশক্তির শ্বাসরোধ করতে চেষ্টা করা, উন্নতিকে আটকানো, বৈষয়িক ও মানবিক শক্তিকে ধ্বংস করা, আন্তর্জাতিক পণ্য বিনিময়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, বিজ্ঞান ও আবিষ্ক্রিয়াকে ব্যাহত করা, মতাদর্শের বিকাশকে চূর্ণ করা এবং সীমিত সংগঠনে কেন্দ্রীভূত স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রগতিবিরোধী আপসে-কাজিয়া-রত, পুরোহিত-তান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার স্তরে—অর্থাৎ সংক্ষেপে বললে দাঁড়ায় বর্তমান শ্রেণী-আধিপত্য বজায় রাখবার জন্য—সমাজকে যেন আরো জোর করে আদিম স্তরে ঠেলে দেওয়া। এই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের পথ। যেখানে বুর্জোয়াশ্রেণী ক্ষমতাসীন—তারা সেই পথের দিকেই অধিকতর পরিমাণে বাঁক নিচ্ছে। এ হল মানবজাতির ধ্বংসের পথ।
অন্য বিকল্পটি হচ্ছে—নূতন উৎপাদন শক্তিকে সামাজিক শক্তি হিসাবে সংগঠিত করা; বর্তমানের সমগ্র সমাজের সাধারণ সম্পদ হিসাবে, সমাজের বৈষয়িক ভিত্তিকে দ্রুততার সঙ্গে প্রভূত পরিমাণে উন্নত করা। দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, ব্যাধি এবং শ্রেণীগত ও জাতিগত বৈষম্য নির্মূল করা; বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির অপরিমেয় অগ্রগতি ঘটানো এবং বিশ্ব-কমিউনিস্ট সমাজকে সংগঠিত করা—যেখানে সমস্ত মানুষ এই প্রথম পরিপূর্ণতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে এবং ভবিষ্যতে মানবজাতির যৌথবিকাশ সাধনে স্ব স্ব ভূমিকা পালন করবে। এই পথ হচ্ছে কমিউনিজমের—উৎপাদন-শক্তির জীবন্ত প্রতিনিধি যে-শ্রমিকশ্রেণী, পুঁজিবাদী শ্রেণী-আধিপত্যের উপর তাদের বিজয়ের দ্বারাই একমাত্র বাস্তবে এই পথ তারা অর্জন করতে পারবে এবং সেদিকেই তারা অধিকতর পরিমাণে মোড নিচ্ছে। এই পথই আধুনিক বিজ্ঞান ও উৎপাদনশীল বিকাশকে সম্ভব ও অপরিহার্য করে তুলবে এবং মানবজাতির ভবিষ্যৎ অগ্রগতির অকল্পনীয় সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে।
এর মধ্যে কোন বিকল্পটি জয়যুক্ত হবে? আজকের সমাজ এই তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
বিপ্লবী মার্কসবাদ দৃঢ়নিশ্চিত যে উৎপাদনশক্তি কমিউনিজমের পক্ষে, অতএব কমিউনিজমই বিজয়ী হবে। কমিউনিজমের বিজয় শ্রমিকশ্রেণীর জয়ের মধ্যে প্রকাশিত হবে—বর্তমান দ্বন্দ্বসংঘাতের একমাত্র সম্ভাব্য চরম পরিণামই হচ্ছে এই। অপর বিকল্পের রাত্রির দুঃস্বপ্ন আর “অন্ধকার যুগ”-এর গা শিরশির করা যে-ছায়া সাময়িক কালের চিন্তানায়কদের কল্পনায় ইতিমধ্যেই উঁকি-দিতে শুরু করেছে, তা পরাভূত হবেই, আন্তর্জাতিক কমিউনিজমের সংগঠিত শক্তি তাকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments